ছবির শেঁকড়: ১

ছবির শেকড় ১: 

THE DAY BEFORE…AYODHYA
Photographer: Raghu Rai/ 1992.
——-

872346947a3102d07be9c869a3b617fb

প্রত্যাশার বাইরে কোন ঘটনা ঘটবেনা ধরে নিয়েই আমরা পৃথিবীতে দিনযাপন করি। আগামীকাল বাকি কাজটুকু শেষ করার প্রত্যাশায় নিশ্চিন্ত মনে আমরা ঘুমাতে যাই; আগামীকাল তো আসছেই কাল সকাল বেলা! অন্তরে উল্লাস নিয়ে তা্ই আমরা চেপে বসি বৃহৎ পাখির পেটের ভিতর; ১২ ঘন্টা পরই তো দেখা হবে প্রিয়জনের সাথে, বিমানবন্দরের ঠিক তিন নম্বর গেট এ।

সেই রকম একটা সুন্দর নিকট ভবিষ্যতের প্রত্যাশাতেই, আগামীকালের ঠিক আগের দিন সকালে একজন সাধু এক পথচারীর হাতে তুলে দিচ্ছিলেন প্রাসাদ। আর ঠিক সেই মুহুর্ত বন্দি হয়ে যায় আর এক সাধকের ক্যামেরায়। হ্যাঁ, আলোকচিত্র শিল্পের সাধক রঘু রাইয়ের কথা বলছি।

কত রকমের তো ছবি হয় – ছড়ার মতো, ছোট গল্পের মতো, বোবা কান্নার মতো। কিন্তু রঘু রায়ের মতন এক ফ্রেমে মহাকাব্য সৃষ্টি করতে পারঙ্গম খুব কম ফটোগ্রাফারই। ছবির সিরিজ দিয়ে গল্প বলার তেমন কোন প্রয়োজন হয়নি রঘু রাইয়ের, কেননা একটা বিস্তারিত গল্প বলার জন্য তা্ঁর একটা ছবিই যথেষ্ট। কিভাবে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে একজন ফটোগ্রাফার আত্মস্থ আর ক্যামেরাস্থ করে ফেলেন একটা বড়সড় গল্প, সেটা একটা বিস্ময়ই বটে। অন্য কোন ফটোগ্রাফারের একটা ছবির গল্প বুঝতে যদি দর্শকের তিরিশ সেকেন্ড লাগে, রঘুর ছবি উপলব্ধি করতে তার লেগে যাবে তিরিশ মিনিট।

এই ছবিটাই দেখি। সাধুকে দেখি না, কিন্তু সাধুর মুখের প্রতিবিম্ব যেন পড়েছে ওই পথচারীর শান্ত, সদাহাস্যজ্বল মুখে। ঠিক তার পিছনেই একটা বিশাল হুলো হনুমান শান্ত হয়ে বসে আছে, ফ্রেমে সৃষ্টি করেছে তীব্র বৈপরীত্য। দুরে দালানকোঠাগুলো ঢেকে আছে ঘন কুয়াশায়। সুন্দর একটা সকাল, একটা প্রতিদিনের প্রত্যাশিত সকাল। শুধু এটুকুতেই শেষ হয়ে যেত হয়তো। একটা ভাল ছবির জন্য আর কি প্রয়োজন? কিন্তু ওই যে বললাম, রঘুর ছবি মহাকাব্যের মতো। কবিতার অলংকারগুলো তো এখনও দেখা বাকি! কুকুরের পায়ে হেঁটে যাওয়া সাধুকে লক্ষ্য করেছেন তো? কিংবা একদম পিছনে আরো কয়েকজন পথচারী হেঁটে আসছে, সেটা? হনুমানজীর একদম মাথার উপর যে কৌণিক ভাবে দুটো হাতি দাড়িয়ে আছে, সেটা? রঘুর ছবির বিশেষত্বই এখানে। তাঁর ছবিতে কোন বিষয়ই মামুলী নয়, কম্পোজিশনের দুর্বলতার কারণে কোনকিছুই হারিয়ে যায়না, বরং প্রত্যেকটি বিষয়েরই কিছু না কিছু বলার থাকে। ফোরগ্রাউন্ড আর ব্যাকগ্রাউন্ড এককার হয়ে যায়, কিন্তু তারপরও কেন জানি সবকিছু পৃথকভাবে ধরা পড়ে। হ্যাঁ, শুধু বোদ্ধার চোখেই ধরা পড়ে। ছবির সামনে দাড়িয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে যান, আস্তে আস্তে গল্প ডালপালা মেলতে শুরু করবে চোখের সামনেই। ভাল কথা, পেছনের হাতির পায়ের গোড়ায় যে আর একজন হনুমান বসে আছেন, সেটা খেয়াল করেছেন?

বলছিলাম প্রত্যাশিত পৃথিবীর কথা। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরের যেই দিন রঘু রায়কে উপহার দিয়েছিল অযোধ্যার এই সুন্দর সকাল, ঠিক তার পরের দিনই পৃথিবীকে উপহার দিয়েছিল হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরপর যেই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় ২০০০ এর ও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়।

“ফটোগ্রাফার, তুমি কি? শয়তান, না সাধু?”
“কোনটাই না। পৃথিবীর পথে আমি ধুলো, কিন্তু সময়কে এক নিমেষে পাথর করে দিতে পারি।”

Knoxville, TN/ February 7, 2014.

Add to Buffer
Share on LinkedInShare on Tumblr Share
This entry was posted in Inside the image: ছবির শেঁকড় and tagged , , , , , , , , , , , .